নিয়মিত কলাম

 

ভিয়েতনাম সফর... ॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর ॥

হ্যা-লং-বেঃ স্রষ্টার অপরূপ কারিশমা
আপনারও ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে না

এম হেলাল  www.helal.net.bd

Iহ্যা-লং-বে হচ্ছে Natural wonder of the world, যা ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজগুলোর অন্যতম। তাই হ্যা-লং-বে ভ্রমণ ব্যতিরেকে ভিয়েতনাম সফর অনেকটাই অপূর্ণ থেকে যায়। সংগত কারণে বাংলাদেশ থেকে যাত্রার পূর্বেই আমার ট্যুর ডাইরেক্টর কাম ট্রাভেল গাইড ড. নাজনীন অন লাইনে স্টাডি করে হ্যা-লং-বে ভ্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল।

সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বোট-ট্রিপে অনেক ঘুরেছি, কিন্তু হ্যা-লং-বেতে দু’দিন ও ১ রাতের বোট-ট্রিপের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ও অফুরন্ত জ্ঞানের সঞ্চয়ন সত্যিই ব্যতিক্রম; যা কিছুতেই ভুলবার নয়, বরং চিরজাগরুক থাকবে স্মৃতিপটে।

হ্যা লং বে -এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল সমুদ্রবক্ষে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে হাজার হাজার সুউচ্চ প্রাগৈতিহাসিক শিলা-পর্বত; নানান আকৃতি, নানান রং। লক্ষ বছর আগে ভূ-গর্ভের কোন্ পরিবর্তনে সমুদ্রবক্ষে এরূপ হাজার হাজার সুউচ্চ শিলা-পর্বত তৈরি হয়েছে, সে রহস্য এখনও অনুদ্ঘাটিত। পৃথিবীর অন্য কোথাও সমুদ্রবক্ষের এত বিশাল অঞ্চল জুড়ে এরূপ অজস্র শিলা-পর্বত নেই। আর এ অত্যাশ্চর্য সৃষ্টির আবিষ্কার-উপভোগ করতেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসে লক্ষ-কোটি ট্যুরিস্ট।

হ্যানয় থেকে শতাধিক কিলোমিটার দূরে হ্যা-লং হারবার থেকে সমুদ্র্রপথে ২ দিন, ৩ দিন বা ৫ দিনের বোট-ট্রিপে আন্তর্জাতিক মানের ভ্রমণ ব্যবস্থা একেবারেই অপূর্ব। ভিয়েতনাম সফরের ৫ম দিন সকাল ৮টায় হ্যানয় থেকে হ্যা-লং হারবারের উদ্দেশ্যে ট্যুরিস্ট বাসে চড়লাম। বাংলার এ ভবঘুরে ছাড়াও বাসে রয়েছে বিভিন্ন দেশের নানা বর্ণের মানুষ; ব্রিটিশ, চাইনিজ, কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান, ডাচ, ইন্দোনেশিয়ান, মালয়েশিয়ান, জিম্বাবুইয়ান, কিউই (নিউজিল্যান্ড), হংকংবাসী।

ট্যুর গাইডের নাম ‘ডাট’। তার এ নামের অর্থ হচ্ছে তীর্থ বা সফল। যাত্রার শুরুতেই নিজের নাম-পরিচয় দিয়ে সে বলল এ দু’দিন আমরা সবাই একত্রে ঘুরব, একই সময়ে খাব; রাতেও একত্রেই ঘুমাব, তবে আলাদা কেবিনে। এরপর সে ভিয়েতনামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর প্রায় ২০ মিনিটের আকর্ষণীয় ও মন ভোলানো বক্তব্য উপস্থাপন করে। ৩ ঘন্টার সে সড়ক যাত্রায় ডাট’র কাছ থেকে জানা গেছে বহু কিছু; বোঝা গেছে উচ্ছল-উজ্জ্বল-প্রাণবন্ত ও প্রো-একটিভ মানুষ কিভাবে অন্যের চিত্ত হরণ করে নিতে পারে! এরূপ মানুষের সাহচর্যে যে কোন নেতিবাচক বা রি-একটিভ মানুষও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রো-একটিভ ও পজিটিভ এটিচিউড লাভ করতে পারে। জীবন-যৌবন সম্পর্কে দৃঢ় আশাবাদী এ যুবক নিজ পরিচয় শেষে বলে- আমি দ্বিতীয় বৌ খুঁজছি, এ বিষয়ে বর্তমান বৌয়ের পারমিশনও নেয়া আছে। তাই ২য় বৌ লাভে তার এই ইন্টারন্যাশনাল এনাউন্সমেন্ট আইনগতভাবেও বৈধ। সে আরও বুঝিয়ে দেয় যে, তার কাছে জাতি-ধর্ম বা বর্ণের কোন বিভেদ নেই। তাই আমাদের যে কারুর সাথেই শ্যালক, ভায়রা, শ্বশুর বা অনুরূপ যে কোন সম্পর্ক স্থাপনে সে প্রস্তুত।

অনুরূপ কৌতুক ও হাস্যরসের মাধ্যমে ডাট আমাদেরকে নানা জম-জমাট তালিম দিতে দিতে যেন নিমেষে পৌঁছিয়ে দেয় হ্যা-লং হারবারে। সেখানে পৌঁছে দেখি এলাহী কা-; ডকে প্রতিদিন থাকে প্রায় ৫০০ বোট। আমরা যে বোটে ভ্রমণ করেছিলাম, সে বোট কোম্পানীর নাম Ha Long Phonix Cruiser, সেটি ছিল মধ্যম সাইজের ও মানের; অর্থাৎ তার চাইতেও বড় ও ছোট বোট রয়েছে। মধ্যম মানের বোট হলেও এর সুযোগ-সুবিধা ছিল আমার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি। বোটের ফ্লোর কার্পেটিং করা; প্রতিটি কেবিনে হট ও কোল্ড ওয়াটার সাপ্লাই, বাথটাব, এসি, আয়রন সেফ ইত্যাকার থ্রি স্টার হোটেলের সুবিধা বিদ্যমান।

ভবানীগঞ্জ, ভোলা বা মংলার নৌকায় চড়ে অভিজ্ঞ এ বাঙালি ইউরোপে গিয়ে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, সুইস বা ডাচ বোটে উঠে এরূপ নতুন অভিজ্ঞতালাভ করেছে- নৌকার ইংরেজি শব্দ ‘বোট’ হলেও প্রকৃতপক্ষে নৌকা ও বোটের গুণগতমান উগিরতলা ও আগরতলার মতই। কিন্তু হ্যা-লং-বে ভ্রমণে গিয়ে দেখলাম, বোটে বোটেও ব্যবধান রয়েছে ব্যাপক। ভিয়েতনামের এসব বোট গুণগত দিক থেকে ইউরোপীয় বোটের প্রায় সমমানের হলেও যাত্রীসেবায়, আতিথেয়তায় এবং রোমাঞ্চকর বিষয় প্রদর্শনে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলনাহীন। তাই বাংলা, ইংরেজি ও হ্যা-লং বোটসহ নানা বোটে হেলে-দুলে শেষতক হ্যা-লং-বে’র বোট সার্ভিসকেই আমি সর্বোচ্চ নম্বর দিতে ইচ্ছুক। দু’দিনের বোট সার্ভিসে তারা কত কিছু যে দেখিয়েছে-বুঝিয়েছে-শিখিয়েছে, তা লিখলে আরো কয়েক পাতা লেগে যাবে। তাছাড়া তাদের সেবা এবং খাবার-দাবারও কন্টিনেন্টাল বা আন্তর্জাতিক মানের। সাগরের অথৈ নীল পানির ওপর ভেসে ভেসে তাদের সার্ভ করা রকমারী সি-ফুড ও ভেজিটেবল রেসিপি দিয়ে যে কোন রুচির মানুষের ভোজন-সন্তুষ্টি তারা অর্জন করবেই। বিপত্তি শুধু ড্রিংক্স ও কিছু খাদ্যে, যেক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক ভেদাভেদে অভ্যস্ততা বা অনভ্যস্ততার জন্য গরমিল হতে পারে। কারণ বুকিংকালীন বা যাত্রাকালীন মাথাপিছু যে ১০০ ইউএস ডলার নেয়, তার বিনিময়ে কেবিন-খাবার-বেড়ানো-ঘুরানো সব সুবিধাই দেবে, দেবেনা শুধু ড্রিংক্স। এই ড্রিংক্সই তাদের ব্যবসায়িক কৌশল। এলকোহলিক বা ননএলকোহলিক সব ধরনের পানি ও পানীয়ই ইউএস ডলারের বিনিময়ে কিনে খেতে হয়। এজন্য বোটের ডাইনিং হলের মধ্যখানে মদ্যপ-লোভাতুরদের জন্য লোভনীয় করে থরে থরে সাজানো থাকে বিভিন্ন পানীয়। আমার মত ভবঘুরে, যার বা যাদের জিহ্বায়তো নয়ই এমনকি চেতনায়ও এরূপ লালা বা লালসা নেই -তাদের সাথে এ ড্রিংক্স ব্যবসা বেশ মন্দা। মাইন্ড কন্ট্রোল্ড মানুষদের সহজাত এ প্রবৃত্তি অন্যদেরকে শুধু বিফলেই ফেলেনা, বিব্রতও করে।

বোটে রকমারী খাবারের উপস্থাপনা ছাড়াও রাতে ছিল Continental Cultural Show । সাগরের বুকে চলতে চলতে রাতের গান ও সুরের মূর্চ্ছনা আমার ন্যায় নিরস মানুষকেও যেখানে করেছে আপ্লুত; সেখানে মদ্যপ সরস মানুষদের আপ্লুতার রকম সকম নিশ্চয়ই ততোধিক বেশি। এসকল amusement ছাড়াও বোট থেকে সকাল-বিকাল সাগরে লাফিয়ে পড়ে সাঁতার কাটার সুযোগ রয়েছে অবাধ।

ভ্রমণকালীন মাঝে মাঝে বোট আপনাকে অবতরণ করাবে Surprising Cave -এ। এসব গুহায় প্রবেশ করে আপনি হারিয়ে যাবেন অভূতপূর্ব ও অত্যাশ্চর্য এক মহাজগতে। সেখানে আপনি পৃথিবীর ভূ-অভ্যন্তরের স্বরূপ কিঞ্চিৎ উদঘাটন বা earth center -এর অভিজ্ঞতালাভ করতে পারবেন।

আপনাকে দেখাবে বিশাল মুক্তা খামার (Pearl Firm), শিলাদ্বীপ (Rock Island), সাদা পাথর (Mine Stone), ভাসমান গ্রাম (Floating Village) ইত্যাদি।

ভাসমান গ্রামঃ
বোটে করে হ্যা-লং-বে ভ্রমণকালীন আমাদেরকে যে ভাসমান গ্রাম দেখানো হয়েছে, তাও এক নতুন অভিজ্ঞতা। এসব গ্রাম ১০০ বছরের পুরোনো। সমুদ্রের পানিতে কিভাবে শত বছর ধরে সপরিবারে বসবাস করছে মানুষ, সে ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার আবিষ্কারে আপনিও হবেন সিক্ত ও শিহরিত।

সাধারণ গ্রামের চাইতে সমুদ্রবক্ষে স্থায়ী ভাসমান গ্রাম যেমনি ব্যতিক্রম, তেমনি এ গ্রামের মানুষদের জীবন-যাপন পদ্ধতিও সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই বোট ও জলযান তৈরিতে দক্ষ। মৎস্য আহরণ ও রপ্তানী তাদের নেশা ও পেশা।

আমরা যে ভাসমান গ্রামটি দেখেছি, সে গ্রামে রয়েছে ২১৪ জন মানুষের ১০০টি পরিবার। তাদের শিক্ষা-দীক্ষার জন্য রয়েছে ভাসমান স্কুল। গড়ে ১১ মিটার গভীর সে সমুদ্রের শত শত কিলোমিটার জুড়ে আরও কত কি যে রয়েছে, তার অন্বেষায় ২/১ দিনের জন্য আলাদা বোটও নেয়া যায়। ৩/৪ সিটের হেলিকপ্টারের ন্যায় আধুনিক এ বোটে করে অজানা আবেশে একলা বা দোকলা ভ্রমণের রোমাঞ্চকর এমন অভিজ্ঞতা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় বলে শুনিনি।

এত্তসব আয়োজনের মাঝে আরও পাবেন কায়াকিং’র অভূতপূর্ব সুযোগ। ‘কায়াক’ হল সমুদ্রে ভেসে বেড়ানোর জন্য বিশেষ আকৃতির অতি ক্ষুদ্র বোট, যা প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থের তৈরি। একেবারে খোলা এ ক্ষুদ্র বোটের মধ্যখানে একটি বা দু’টি গর্তের মত থাকে, সে গর্তে ঢুকে কোমর পর্যন্ত পা সামনের দিকে মেলে দিয়ে বসতে হয়। বড় কায়াকে দু’জন ও ছোট কায়াকে একজন বসা যায়। তারপর বৈঠা নিয়ে নীলাকাশের নিচে নীল সাগরে ভেসে বেড়ানো। লাইফ জ্যাকেট পরে স্ত্রীসহ কায়াকে উঠে যখন বিশাল সমুদ্রবক্ষে বৈঠা চালাচ্ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল- ...সময় থমকে গেছে, এই সুনীল আকাশ ও পানির মাঝে সবুজে ঢাকা প্রস্তর ও শিলার অপরূপ প্রকৃতিই আমার ঠিকানা। শান্ত-স্নিগ্ধ নীল জলরাশির মাঝে উঁচু হয়ে উঠে গেছে বিশাল বিশাল শিলা-পর্বত। সুবিস্তৃত প্রকৃতির সুবিশাল আকাশ ও সুগভীর জলরাশিতে এমনই ক্ষুদ্র কায়াকে আমরা ভেসে বেড়াচ্ছি, এই বুঝি সাগরের গহীনে কায়াকসহ তলিয়ে যাচ্ছি... -এ অভিজ্ঞতা অভূতপূর্ব, প্রকৃতির এই বিস্ময়কর লীলা বিশ্বে অদ্বিতীয়। পড়ন্ত বিকেল তথা গোধূলী লগ্নের আলো-ছায়ার লুকোচুরিতে কায়াকিংয়ের এ স্মৃতি থাকবে চিরজাগরুক।

হ্যা-লং-বে ঘুরতে ঘুরতে এবং প্রকৃতির বিচিত্র বিষয় আবিষ্কার করতে করতে ভাবনার আকাশে বারংবার চলে আসে আমার প্রিয় জন্মভূমির কথা, বাংলাদেশের কথা, দুর্ভাগা জননীর কথা। অপরূপ সুন্দরী, সমৃদ্ধা ও ভাগ্যবতী যে বঙ্গজননী তার সন্তান তথা আমাদেরকে মানুষ করতে না পেরে এখন বিশেষায়িত হচ্ছে ‘দুর্ভাগা’ জননীরূপে। সবুজ-শ্যামল বাংলার বিশাল প্রান্তর এখন নিঃগৃহীত হচ্ছে বিরাণভূমির পোড়াকপালীতে।

ভিয়েতনামের river management, sea mgt, cannel mgt, lake mgt, agricultural firm mgt, road & transport mgt ইত্যাকার প্রাকৃতিক সম্পদের অর্থকরী ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনায় আমি এমনই ঈর্ষান্বিত যে, ২০ বছর পূর্বেকার এগিয়ে থাকা সগৌরবের বাঙালি এ অল্প সময়ের ব্যবধানেই কিরূপ অদক্ষতা, ঔদাসিন্যে বা অবহেলায় তাদের মাতৃভূমিকে ভিয়েতনামের তুলনায় বহুদূর পিছিয়ে দিয়েছে, তা মেনে নিতে পারছি না। এখন সমতা আনতে হলে আগামী ২০ বছর কথা না বলে শুধু কাজ, কাজ আর কাজ করে যেতে হবে আমাদেরকে।

সমুদ্রে ভাসমান ১০০ পরিবারের গ্রাম দেখে আফসোস হচ্ছিল, আমাদের সদাশয় সরকার বাংলাদেশের উপকূলের সমুদ্র সীমানায় বাঙালি মৎস্যচাষী বা জেলেদেরকে নিরাপত্তা ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধাসহ কিছু সস্তা-সুবিধাও যদি করে দিত, তাহলে আমরা হারিয়ে ফেলতাম না আমাদের অভিজ্ঞ জেলেদের। প্রতিবছর ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে দক্ষ মৎস্য শিকারী না হারালে আমরা মৎস্য রপ্তানীতে বিশ্বশীর্ষ না হলেও নিদেনপক্ষে মাছে-ভাতে বাঙালির ঐতিহ্যটুকুনতো ধরে রাখতে পারতাম। চোরাইপথে আসা ফরমালিন মাখা বার্মিজ ও ইন্ডিয়ান মাছ খেয়ে নাড়ীভুড়ি পচিয়ে ফেলতে হতো না, প্রয়োজন হতো না এত ডাক্তার-হাসপাতালের।

লেক ম্যানেজমেন্টঃ
হ্যানয় শহরে ১৮টি লেক রয়েছে। Hoan Kiem Lake, West Lake এবং Truc Bach Lake শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত। এসব লেকের ম্যানেজমেন্ট এমন পরিকল্পিত যে লেকের ধারে বসলে বা পাশ দিয়ে ঘুরলে মন জুড়িয়ে যায়। অপরিচ্ছন্নতার কিছু নেই, দুর্গন্ধ নেই, বিশৃঙ্খলা নেই, বখাটেপনা বা উচ্ছৃঙ্খলতাও নেই। একবার ঘুরে এলে আবারও যেতে ইচ্ছে করবে।

মধ্যরাত অবধি হোয়ান কিয়েম লেকের চারিধার ঘুরতে ঘুরতে তাদের লেক ম্যানেজমেন্টের নেপথ্য মানুষদের কথা ভাবনায় চলে এলো। ৪৫ ডিগ্রি কৌণিকভাবে আকাশে চোখ রেখে বললাম- হে স্রষ্টা, হ্যানয়ের এ ম্যানেজারদের মত কিছু ম্যানেজার আমাদের দেশে পয়দা করে দাও না প্লিজ। তবে আমাদের দেশের ম্যানেজারদের সাথে এদের বিনিময় করোনা যেন, তাহলে আবার হ্যানয়ের লেকগুলো রমনা লেক বা ধানমন্ডি লেকের মতই অব্যবহার্য হয়ে পড়বে যে!

স্রষ্টার নিকট আকুল প্রার্থনায় এমন আপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম যে, রাতের আকাশ থেকে চোখ নামাতেই ইচ্ছা করছিল না। স্রষ্টার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করে না নিয়ে ঐ অনুভব থেকে ফিরে আসতে চাইছিল না পাগল মন। কিন্তু আমাদের দেশের ম্যানেজাররা যেরূপ জনগণের সাথে ঠাট্টা করে পার পেয়ে যায়, স্রষ্টার সাথে সেরূপ ঠাট্টা করেতো আমি পার পাব না। তাই আমার জীবদ্দশায় হ্যানয় লেকের অন্তত ১০% উন্নয়ন যেন ঢাকার লেকগুলোয় দেখে যেতে পারি, তা চেয়ে ‘আমিন’ বললাম।

দুর্বল ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়দের একমাত্র অবলম্বন স্রষ্টা। এজন্যই কেউ কেউ বলে, ধর্ম হচ্ছে অসহায়দের সহায়। তাই আমার ন্যায় অসহায় বাঙালি, যারা শত শত বছরের শাসন-শোষণে জর্জরিত; অবিচারের জ্বালায় জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার ও কয়লারূপী কবি হয়ে গেছে, কবিতায়-গদ্যে-উপন্যাসে ও কলামে যা লিখেছি, তা শুধু কাগজ আর কলমের মধ্যেই রয়ে গেছে। কাগজ শেষ হয়ে যাচ্ছে, কলমের কালি ফুরাচ্ছে, রাতের আঁধার কেটে ভোরের পূবাকাশে রক্তিম লালিমা দেখা যাচ্ছে। এ লালিমা যেন নির্দেশ দিচ্ছে- আর ১০টি বছর অপেক্ষা করো, সামাজিক যুদ্ধ আরো বেগবান করে তোল; বঙ্গবন্ধুর সে কণ্ঠও যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল; ...রক্ত যখন দিয়েছি আরো দেব, দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ। মুক্তিযুদ্ধে যেমনি বাঁশের লাঠি দিয়ে বিজয় এসেছে, তেমনি আগামীর সামাজিক যুদ্ধেও তোর এ কলমের ভূমিকা হবে অবারিত।

উদীয়মান সূর্যের এ আশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে সাড়ে ৮টার অফিস প্যাসেঞ্জার আমি যখন খানিকটা তন্দ্রাচ্ছন্ন, তখন মানব মুক্তির তৃষিত চাতক কবি ফররুখ আহমদের কাব্যকথা যেন ধ্বনিত হচ্ছিল এ ভবঘুরের মরমে-
রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী?
এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।
রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী?

ওয়াটার পাপেট-শোঃ ভিয়েতনামীদের কৌশলগত দক্ষতা

জাতীয় আয় বৃদ্ধির বিভিন্ন কৌশলগত দক্ষতায়ও ভিয়েতনাম আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। World Gold Medal অর্জনকারী শিল্পী পেন কিম থানাহ্ -এর প্রতিভাদীপ্ত উদ্ভাবন Bamboo Xylophone এর সুরের মূর্চ্ছনা উপভোগের পর স্ত্রী বলে- কাল আমরা ওয়াটার পাপেট-শো দেখতে যাব। বললাম, পুতুল নাচ দেখে আমার পোষাবে না। বলল- এদের এ শো বিশ্বখ্যাত, পৃথিবীর নানা দেশ থেকে মানুষ আসে ওয়াটার পাপেট-শো দেখতে; আমি নিশ্চিত, তোমারও ভাল লাগবে।

আমার বাচ্চারা যখন আরো ছোট ছিল, তখন তাদের মা উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে ছিল বলে তাদেরকে একটু বেশি বেশি বেড়াতে নিয়ে যেতাম, বিভিন্ন চিত্তাকর্ষক বিষয় দেখাতাম ও ব্যতিক্রমী খাবার খাওয়াতাম। সে কার্যসূচি বা দায়িত্বের অংশ হিসেবে দু’বার তাদেরকে সোনারগাঁও এবং শেরাটন হোটেলে পাপেট-শো দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। সে সুবাদে জনপ্রতি ৫০০ টাকা দিয়ে শিশুদের সাথে শিশু হয়ে পুতুল নাচ দেখেছি। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও টিভিতে পুতুল নাচের বহুত কারিশমা দেখেছি। সে কারণেই হ্যানয়ে গিয়ে ওয়াটার পাপেট-শো দেখতে স্ত্রীর প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিলাম।

তবে পরদিন অপরূপ Hoan Kiem Lake ধরে হাঁটতে হাঁটতে অকস্মাৎ চোখ পড়ে যায় একটি স্পটে বহু বিদেশীর ভীড়। কাছে গিয়ে দেখি স্ত্রীর কাক্সিক্ষত ওয়াটার পাপেট-শো’র টিকেট কাউন্টার সেটি। স্ত্রীর অবুঝ প্রস্তাবে সবুজ সিগন্যাল সরাসরি না দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অন্য বিদেশীদের পেছনে লাইনে দাঁড়ালাম -শরৎচন্দ্রের সেই বিখ্যাত কথার ন্যায়, ‘যেখানে এত মানুষের প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে আমারওতো প্রয়োজন থাকতে পারে’! কিন্তু টিকেট যে নেই, তা জানা গেল কিছুক্ষণ পর। তারপরও এত বিদেশী কেন লাইনে দাঁড়িয়ে?

আমাকে লাইনের হাল ছাড়তে নিষেধ করে স্ত্রী একটু এগিয়ে গিয়ে জেনে আসলো- ১০ জন পর্যটকের এক গ্রুপ একত্রে শো দেখবে। কিন্তু তাদের কাছে অগ্রিম কেনা টিকেট আছে মাত্র দু’টি। ওদিকে কাউন্টারের বর্তমান শো’র সব টিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। এখন উপায় দু’টি। হয় তাদের দু’জন এ শো দেখবে নতুবা ১০জনকে একত্রে অন্যদিন দেখতে হবে। তাদের সম্ভাব্য সমর্পিতব্য দু’টি টিকেট পাবার জন্য অন্যদের মতো আমরাও টিকেট বিক্রেতাকে বলে রেখে ‘চান্স মোহাম্মদ’ হয়ে অপেক্ষা করছিলাম এবং সে সুযোগে আমি তাদের অডিটোরিয়াম ভবন ও শো-স্যুভেনির দেখছিলাম। আমার মানসিকতা হচ্ছে টিকেট পেলে ভাল, তাতে স্ত্রীর মন রক্ষা হবে, আর না পেলেও ক্ষতি নেই। পুতুল নাচ না দেখার opportunity agin হিসেবে অন্য অনেক কিছু হয়ত দেখতে পারব।

খানিক পরে স্ত্রী এসে বলে- টিকেট পেয়েছি। টিকেটপ্রতি ১ লক্ষ ডং বা ৫ ডলারের বিনিময়ে অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করে দেখি, ৩/৪ শত বিদেশী দর্শকে তা টইটম্বুর। সবাই যেন উন্মুখ হয়ে আছে প্রদর্শনীর অপেক্ষায়। কেবল সামনের সারিতে দু’টি সিট ফাঁকা। সে সিটে আমরা বসার সাথে সাথেই প্রদর্শনী শুরু হয়ে গেল। অধিপতির প্রবেশমাত্রই যেমনি অপেক্ষমান সভাসদ ঘটা করে সভার কাজ শুরু করে, তেমনি এ বিলম্বিত ভবঘুরে সিটে বসার সাথে সাথেই অডিটোরিয়ামের বাতি নিভে যায় এবং পার্শ্বমঞ্চে ভিয়েতনামী তন্বী-শিল্পীদের গান ও সুরের সাথে মূল মঞ্চে শুরু হয় পানির ওপর পুতুল নাচ।

মঞ্চসজ্জা একেবারেই ব্যতিক্রম ও অপূর্ব। দর্শক-শ্রোতার সম্মুখে যেখানে সাধারণত মঞ্চ থাকে, সেখানে রয়েছে ছোট্ট পুকুর, পুকুরের পশ্চাতে মাচার কুঁড়ে ঘর এবং পুকুরের ডানে বাদক ও শিল্পীদের মঞ্চ। পুতুলগুলো পানির ওপর ভেসে ভেসে দেখাচ্ছিল নানান কসরত।

পূর্বে ভেবেছিলাম- স্ত্রী যখন পাপেট-শো দেখবে, সে সুযোগে আমি তার পাশে বসে জেটল্যাগ কাটাবো তথা ঝিমিয়ে নেব। কিন্তু শো শুরুর পর ঘুমানোতো দূরের কথা, ৯০ মিনিট যেন পার হয়ে গেল এক নিমেষে। কৌশলগত ও প্রতিভাদীপ্ত কারিগরী দক্ষতায় পানির ওপর পুতুল নাচের মনোমুগ্ধকর সে প্রদর্শনী শুধুই উপভোগের এবং বিস্ময়ে অনুভবের।

ভিয়েতনামের ইতিহাস-ঐতিহ্য-ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর অপরূপ এ উপস্থাপনা কেবল সবার চিত্তই হরণ করে না, এটি অভূতপূর্ব সৌন্দর্যমন্ডিত অর্থনৈতিক শিল্পও বটে। পানির ওপর ছেলেমানুষী পুতুল খেলা দেখিয়ে নিজ দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সে সাথে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অপূর্ব কৌশল শুধু অনুকরণীয়ই নয়, আমাদের মত হত-দরিদ্র চিত্তের মানুষদের জন্য বিশেষ শিক্ষণীয়ও বটে। -চলবে।

লেখকঃ
লক্ষ্মীপুর বার্তা ও ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক
ফোনঃ ৯৫৫০০৫৫, ৯৫৬০২২৫
ই-মেইলঃ m7helal@yahoo.com

 
 
lbheading